আসুন…মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার প্রতিজ্ঞা করি

Posted: জুলাই 9, 2010 in ওপেন সোর্স
Tags: , , , , ,

লিখেছেনঃ রিপন

প্রথমেই বলে নিই মূল লেখাটি এখানে। লেখক অভ্রনীল। আজ সন্ধ্যায় তাঁর লেখাটি পড়ে এতো ভালো লেগেছে যে, টেকটিউনস্-এ লেখাটি প্রকাশ করতে অনুরোধ করেছি। সাথে এও বলেছি যে, টেকটিউনস্-এ লেখাটি প্রকাশ করার মতো আপনার সময়, সুযোগ না থাকলে আমাকে অনুমতি দিন। টেকটিউনস্- এ তাঁর কোন একাউন্ট না থাকায় তিনি আমাকে অনুমতি দিয়েছেন (ইমেইলে)। অনুমতি নিয়ে শিরোনাম অপরিবর্তিত রেখে লেখাটি টিউন করছি।

2010-07-04 23 06 42

আচ্ছা! চুরির সংজ্ঞা কি? কেবল যে চুরি করে শুধু সে-ই চোর? নাকি যারা তাকে চুরি করতে উৎসাহিত করলো তারাও চোর? যারা চুরি করতে ইন্ধন যোগায় বা উৎসাহিত করে তারা কি চোরের চেয়ে কোন অংশে কম? ধরুন আপনার মোবাইল ফোন দরকার, কিন্তু আপনার পঞ্চাশ হাজার টাকার মোবাইল কেনার সামর্থ্য নেই। হঠাৎ একদিন অফার পেলেন যে ঐ মোবাইলটার একটা চোরাই ভার্সন হাজার পাঁচেক টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আপনি কি করবেন? আপনি কি সেই চোরাই জিনিসটা অল্পমূল্যে কিনে ব্যবহার করবেন? নাকি পাঁচ হাজার টাকায় নতুন একটা ফোন কিনবেন যাতে আপনার প্রয়োজনীয় কাজগুলো (কথা বলা, টেক্সট করা ইত্যাদি) করা যায়? একজন চোরের কাছ থেকে একটা চুরির জিনিস কিনে ব্যবহার করতে কি আপনার এতটুকু খারাপ লাগবেনা? কখনো কি মনে হবেনা এই যে আপনি টাকাটা খরচ করলেন চোরাই জিনিসটা কেনার জন্য, এটা করে আপনি আসলে একজন চোরকে আবার চুরি করতে উৎসাহী করলেন?

প্রফেসর হ্যারি বাওম্যান বেশ হাসি খুশি লোক। এই লোকের ক্লাশ করার ভাগ্য হয়েছিল আমার। তো প্রথমদিন এই ডাচ প্রফেসর ক্লাসে কে কোন দেশ থেকে এসেছে জানতে চাইলে যখন বললাম বাংলাদেশের কথা, তখন দেখি তার ঠোঁটের কোনায় হাসি। সেই হাসি মাখা মুখেই বলল যে সে বাংলাদেশকে চেনে। আমারতো ঘাম ছুটে গেল, কারন ভালো কোন দিক থেকে বাংলাদেশকে চেনার কোন কারন নাই, এখন ভরা ক্লাসের সামনে কোন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে কে জানে! ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করছি। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলল যে সে বাংলাদেশকে চেনে জর্জ হ্যারিসনের কল্যানে! আরে যোগ করলেন হল্যান্ডও এককালে বাংলাদেশের মত বন্যাপ্রবন দেশ ছিল, তাঁর আশা হল্যান্ডের মত বাংলাদেশও একসময় এই বাধা কাটিয়ে উঠবে। যাক বাবা, এই যাত্রায় বেচে গেছি ভেবে ক্লাস পুরোটা করলাম। ক্লাস শেষে বেরুতে যাব এমন সময় তিনি আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন বাংলাদেশ কি এখনো দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয় কিনা? তারপর আরো কথার মাঝে কথায় কথায় বললেন যে “… তোমাদের তো আসলে সবাই চুরি করে, উপর থেকে শুরু করে নিচে সবাই। এই যেমন তোমরা কখনো আসল সফটওয্যার কিননা, কেবল চুরিই কর…”। নিজেকে এভাবে চোর শুনতে কার ভাল লাগে? কিন্তু এটাই বাস্তব! দেশের বাইরে আমাদের পরিচয় চোর হিসেবে যারা যা পায় তাই চুরি করে। বাইরের দেশগুলোতে আমাদের ভাবমূর্তি খুব একটা ভালনা। সহজভাবে বললে তারা আমাদেরকে নিকৃষ্ট হিসেবে দেখে।

ট্রেড রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টিং রাইটস (ট্রিপস) এর একটা বেশ বিখ্যাত চুক্তি আছে। এ চুক্তি অনুসারে পৃথিবীর সব দেশের মেধাসম্পদের সর্বজনীন সংরক্ষণের কথা বলা আছে। কিন্তু বাণিজ্যে সমতা সৃষ্টির জন্য উন্নত বিশ্ব আর স্বল্পোন্নত বিশ্বকে তো আর একই কাতারে ফেলা যায় না। তাই কপিরাইট বিষয়ে ডব্লিউটিওতে দরিদ্র−ভদ্র ভাষায় স্বল্পোন্নত দেশগুলো ছাড় পাওয়ার জন্য হইচই করে। শুরুতেই ট্রিপসে ২০০৬ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে ছাড় দেওয়া হয়। পরে ২০০৫ সালে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সেই ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানো হয়। ট্রিপসে বলা আছে যে, স্বল্পোন্নত দেশগুলো সাড়ে সাত বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত বিদেশি কপিরাইট, পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও অন্যান্য মেধাসম্পদের ক্ষেত্রে এবং ১১ বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ওষুধ শিল্প ছাড় পাবে।

স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে এই ছাড় দেওয়ার কারণ হচ্ছে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সব দেশ যাতে সমান সুযোগ পায়। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো অনেক এগিয়ে। এখন তথ্যপ্রযুক্তি তথা মেধানির্ভর বিশ্ব বাণিজ্যে টিকে থাকতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সক্ষম হতে হবে।

তাহলে কি দাঁড়ালো? বাংলাদেশ ও ঐ ছাড়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তার মানে কি আমরা নির্বিচারে পাইরেটেড সফটওয়ার ব্যবহার করব? খেয়াল করুন এইখানে “ছাড়” শব্দটা ব্যবহার করা হচ্ছে। ছাড় কখন দেয়া হয়? যখন কোন অপরাধ করা হয় তখন সেটাকে পাশ কাটানোর জন্য বলা হয় যে “তাকে ছাড় দেয়া হল”। কালো টাকা সাদা করার ঘোষনায় “ছাড়” পাওয়া চোরাকারবারিরা যেমন অপরাধী থেকে নিষ্পাপ মানুষে পরিবর্তিত হয়না তেমনি ট্রিপসের ছাড়ের কারনে কিন্তু পাইরেটেড সফটওয়ার ব্যবহার করাটা জায়েজ হয়ে যায়না। সোজা কথায় কপিরাইট ভঙ্গ আসলে “অপরাধ” কিন্তু উন্নত বিশ্ব আমাদের “করুনা” করছে। ট্রিপস চুক্তি অনুসারে সফটওয়ার পাইরেসি করা সত্ত্বেও ওরা আমাদের “সরাসরি” চোর বলতে পারছেনা, কিন্তু ২০১৩ সালের পর কিন্তু আমরা লিখিতভাবে চোর হয়ে যাব!

– “বাংলাদেশে আমরা কম্পিউটার নামক যন্ত্রটার সাথে ফ্রীতে একগাদা সফটওয়ার পেয়ে অভ্যস্ত। নতুন কেনা কম্পিউটার কিনে সুইচ অন করলেই মনিটরের পর্দায় ভেসে উঠে উইন্ডোজের চেহারা। আপনি কি জানেন আপনার পিসির সাথে পুরে দেয়া উইন্ডোজটি যে চুরি করা?”

– “কে কইছে চুরি করসি! দামাদামি কইরা ত্রিশ টাকা খরচ কইরা কিনছি মিয়া। আমারে চোর কন!”

– “মাইক্রোসফট কোম্পানী যে জিনিসের দাম রাখে বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা সেটাই আপনি দোকান থেকে কিনছেন ত্রিশ টাকা দিয়ে। এবার ভাইজান বলেন যে আপনি চোর না!”

– “আবার কয় আমি বলে চুরি করছি। আরে মিয়া দুকান্দার কোত্থেইকা এইটা আনসে সেইটা আমি জানিনা, আমার জানবারও দরকার নাই। দুকানে সিডি ছড়াইয়া বেচতাসে, টাকা দিয়া কিনসি। মাগনা চুরি কইরা আনিনাই। গাটের টাকা খরচ করসি… হুমম।”

– “গাটের পয়সা খরচ করেছেন ভালো কথা, কিন্তু কিসের পিছনে? একটা চোরাই মালের পিছনে! “

– “এই চুরি তো সেই চুরি না। আমাগো আসলটা কিনবার সামর্থ্য নাই। তাই এইটাই তো কিনতে হবে।”

– “ধরুন আপনার পনর লক্ষ টাকার গাড়ীটা কেউ চুরি করে এক লাখে বিক্রি করে দিল। যে চুরি করলো সেতো চোরই যে জেনেশুনে কিনল তাকে কি বলবেন?”

– “ঐ ব্যাটাও চোর। ওর চৌদ্দগুষ্ঠি চোর। জাইনাশুইনা চুরি করা গাড়ি কিনসে, কোন ভদ্রলোকে এই কাজ করে?”

– “ভাইরে… তাহলে তো আপনিও চোরের কাতারে পড়েন। জেনেশুনে চোরাই সফটওয়ার ব্যবহার করছেন।”

– “আরে ভাই… ঐ লোকের পয়সা দিয়া গাড়ি কিনবার সামর্থ্য নাই তো গাড়ি কিনবে ক্যান? বাস, ট্যাক্সি কি দেশ থেইকা উইঠা গেছে? ঐ ব্যাটার তো অন্য আরো রাস্তা খোলা আছে। কিন্তু আমারটা ভাবেন, উইন্ডোজ ছাড়াতো আর কোন উপায় নাই! রাস্তাতো একটাই!”

– “নারে ভাই! রাস্তা আরো আছে। উইন্ডোজই একমাত্র অপারেটিং সিস্টেম না, আরো কয়েকটা অপারেটিং সিস্টেম আছে। এগুলোর মধ্যে ফ্রি বিএসডি, ওপেন সোলারিস এবং লিনাক্স ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেমগুলোর (উবুন্টু, ওপেনসুস্যে, মিন্ট, ডেবিয়ান ইত্যাদি) সিংহভাগই একেবারে মাগনা। শুধু তাইনা সাথে আছে অনেক ফ্রি সফটওয়ার। আর ঐগুলা ব্যবহার করলে কারও বাপের গায়ে জ্বর যে আপনাকে চোর বলে। আগের জনকে যেভাবে চোরাই গাড়ির বিকল্প দেখিয়ে দিলেন এখনতো আপনিও চোরাই সফটওয়ারের বিকল্প পেলেন। এখন বলেন কি করবেন!”

“চোর” শব্দটা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের দুটো পথ খোলা আছে। প্রথম পথটা বেশ কঠিন, সেটা হল পাইরেটেড সফটওয়ার ব্যবহার না করে সফটওয়ারগুলোর জেনুইন ভার্সনগুলো কিনে ফেলা। আমাদের মত গরীব দেশের কম্পিউটার ইউজারদের জন্য এই পন্থাটা বেশ কঠিন, বলতে গেলে অসম্ভব। কারন উইন্ডোজ, এমএস অফিস আর এন্টি ভাইরাস সফটওয়ার – এই তিনটার কথা চিন্তা করলেই কিন্তু একটা কম্পিউটারের জন্য কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হবে। তাহলে খোলা থাকলো দ্বিতীয় পথটা, ফ্রি ওপেনসোর্স সফটওয়্যারে নিজেদের বদলে ফেলা। এই পন্থায় বলতে গেলে কোন সমস্যাই নাই। ফ্রিবিএসডি, সোলারিস বা লিনাক্স বেজড ডিস্ট্রগুলোতে ভাইরাসের ঝামেলা নাই, তাই এন্টিভাইরাসের কথা ভুলে যাওয়া সম্ভব। আর যদি ব্যবহার বান্ধবতার কথা চিন্তা করেন তবে চোখ বন্ধ করে লিনাক্স ভিত্তিক উবুন্টু বা মিন্ট ব্যবহার করা যায়। উইন্ডোজে যা করতেন তার সবই কিন্তু উবুন্টু বা মিন্টে করা সম্ভব। যে কাজ আপনি চুরি করে কিনে অবৈধভাবে করছেন, সেই কাজগুলোই কিন্তু উবুন্টু বা মিন্টে করতে পারবেন বিনা ঝামেলায়।

তাছাড়া অনেকেই কিন্তু ইতিমধ্যে ফায়ারফক্স, থান্ডারবার্ড, ভিএলসি প্লেয়ার, ওয়ার্ডপ্রেস, জুমলা, দ্রুপাল, ফাইলজিলা, পিএইচপি, পাইথন, জাভা ইত্যাদি ওপেনসোর্স সফটওয়ার ব্যবহার করছেন জেনে কিংবা না জেনে। যারা এসব ব্যবহার করছেন তাদের নিশ্চয়ই ওপেনসোর্স সফটওয়ারের ক্ষমতা বা কোয়ালিটি নিয়ে কোন সন্দেহ থাকার কথা না। যেখানে ওপেন সোর্স সফটওয়ার বিনা পয়সায় আমাদের মুক্তি দিতে পারে সেখানে কেন আমরা শুধু শুধু নিজেদের গায়ে “চোর” তকমাটা লাগিয়ে রাখবো?

আপনি নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন হঠাৎ করে কেন আমি এইসব জিনিস নিয়ে পড়লাম? আসলে নিজের জাতি সম্পর্কে কটু কথা শুনতে কারই বা ভালো লাগে বলেন? তবে একটু চেষ্টা করলেই কিন্তু চোর অপবাদটা ঝেড়ে ফেলে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। কিন্তু সেই চেষ্টাটাই আমরা করছিনা। শুধু যে করছিনা তা না, আমরা হাত পা গুটিয়ে বসে আছি যাতে চেষ্টাটা না করতে হয়। কিন্তু এখন থেকেই আমাদের সচেতন হতে হবে না হলে দেখা যাবে যে ২০১৩ সালে সরকারকে মোটা দাগের টাকা অপচয় করে সরকারী কাজে গাদা গাদা লাইসেন্স করা সফটওয়ার কিনতে হচ্ছে। সেই সাথে সাধারন ইউজাররাও পড়বে ঝামেলায়। যেহেতু উইন্ডোজের বাইরে আর কিছু নিয়ে তাদের কোন ধারনা নেই তাই স্বভাবতই তাদেরকেও মোটা দাম দিয়ে উইন্ডোজ কিনতে হবে, সেই সাথে দামী দামী সব সফটওয়ার। তাই এখনই সময় সাধারন পিসি ইউজারদের এই ব্যাপারটা নিয়ে সচেতন হবার এবং করার। আর কিভাবে এ কাজটা করা যায় সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে আমাদের প্রযুক্তিতে। তাই যারা এসব নিয়ে মাথা ঘামান বা যারা এ আলোচনায় অংশগ্রহন করতে চান, তাদের প্রতি অনুরোধ রইলো আমাদের প্রযুক্তিতে আপনার মূল্যবান মতামতটা প্রদান করুন।

আমরা কি ছোট্ট একটা প্রতিজ্ঞা করতে পারিনা যে আমরা আমাদের ‘চোর’ তকমাটাকে বিদায় জানাবো। নতুন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো বিশ্ব দরবারে। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোটা কঠিন না কিন্তু মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার স্বিদ্ধান্ত নেয়াটাই কঠিন। একবার স্বিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে মাথা উঁচু করাটা কোন ব্যাপারই না। এই লেখাটা দিয়ে একজনকেও যদি মাথা উঁচু করে দাঁড়া করাতে পারি তাহলেই আমার লেখাটা সার্থক হয়েছে বলে মনে করব।

Source

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s